বিড়াল কি কি কারণে মারা যায়?

বিড়াল কি কি কারণে মারা যায়? পোষা প্রাণীদের মধ্যে বিড়াল হলো অনেক মানুষেরই সবচেয়ে প্রিয় প্রাণী। কেননা যারা বিড়াল পুষেছে তাদের প্রত্যেকেরই রয়েছে একটি অনন্য ও চিত্তাকর্ষক অভিজ্ঞতা। একটি বিড়ালের মালিক হিসাবে আপনার বিড়াল যাতে পূর্ণাঙ্গ জীবনযাপন করে সেটা নিশ্চিত করতে আপনার পক্ষে যতটুকু সম্ভব, তার সবকিছু দিয়েই আপনি হয়তো চেষ্টা করেন যেন আপনার সুস্থ থাকে এবং দীর্ঘ দিন বাঁচে।

তবুও দেখা যায় যে, কয়েক মাসের মধ্যেই অনেকের বিড়াল শারীরিক বিভিন্ন অসুস্থতার কারণে কিংবা অন্য কারণে মারা গেছে। এজন্য অবশ্যই আপনার বিড়াল কী কী কারণে মারা যায় এবং কিভাবে সেগুলো প্রতিরোধ করা যায় তা জানা আপনার একান্ত অত্যাবশ্যক৷

বিড়াল কি কি কারণে মারা যায়?

বিভিন্ন কারণে আপনার বিড়াল মারা যেতে পারে। কিন্তু নিচে ৭টি উল্লেখযোগ্য কারণের কথা তুলে ধরা হলো:

১. ইথানাসিয়া

বিড়ালের মৃত্যুর কারণগুলোর মধ্যে এই কারণটি সবচেয়ে হৃদয়বিদারক কারণ হবে, কেননা একজন বিড়াল প্রেমিক হিসাবে এই কারণটি আমায় সবচেয়ে বেশি বিস্মিত ও দুঃখিত করে। শুনতে খারাপ লাগলেও দুর্ভাগ্যবশত এটা সত্যি যে, ইথানাসিয়া (Euthanasia) বিড়াল ও কুকুর এই দুটি পোষা প্রাণীর মৃত্যুর কারণের মধ্যে এক নম্বর প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে।

আর ইথানাসিয়ার কারণে মৃত্যু যেকোনো বয়সের বিড়াল ও কুকুরের ক্ষেত্রেই হতে পারে। ২০১২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ছোট শহরের ৬৩৪টি বিড়ালের মধ্যে ৪৮৭টি (৭৮%) বিড়াল ও বিড়ালছানা ইথানাসিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার জন্য তাদের পশুচিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছিল।

গভেষকরা পরবর্তীতে এই বিড়ালদের মৃত্যুর এক নম্বর কারণ হিসাবে ইথানাসিয়াকে দায়ী করেন যা মোট ৮৫.৭% বিড়ালের মৃত্যুর জন্য দায়ী। তবে বর্তমানে সৌভাগ্যবশত ইথানাসিয়ার দ্বারা মারা যাওয়া বিড়ালের সংখ্যা কমাতে চিকিৎসা বিজ্ঞানে অনেক পদ্ধতি এসেছে।

দক্ষিণ ক্যারোলিনার স্পার্টানবার্গ শহরের প্রাণী সুরক্ষা অধিদপ্তরের প্রধান তাদের শহরে বিড়ালদের মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে বেশ কিছু পদ্ধতির কথা বলেছেন, যেগুলো অনুসরণ করে আপনিও আপনার বিড়ালকে ইথানাসিয়ার হাত থেকে বাঁচাতে পারেন।

কিভাবে পরিত্যাক্ত বিড়াল ছানার যত্ন করবেন? জানতে পড়ুন

২. ট্রমা

‘দ্যা রয়্যাল ভেটেরিনারি কলেজে’ এর গবেষণায় বিড়ালের মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ইংল্যান্ডের ৯০ টিরও বেশি পশুচিকিৎসা কেন্দ্রের থেকে ১০০,০০০টিরও বেশি মৃত বিড়ালের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। আর এ গভেষণায় দেখা গেছে যে, ট্রমা হলো বিড়ালদের মৃত্যুর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কারণ যা সমস্ত বয়সের বিড়ালের ১২.২% মৃত্যুর জন্য দায়ী। তাছাড়া এটা লক্ষ্য করা যায় যে, ট্রমা আসলেই ৫ বছরের কম বয়সী বিড়ালদের মৃত্যুর জন্য ১ নম্বর কারণ।

এ গভেষণাটি এটাই নির্দেশ করে যে, ৫ বছরের বেশি বয়সী বিড়ালদের তুলনায় ০-৫ বছর বয়সী বিড়ালদের ট্রমার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। ৫ বছরের কম বয়সী এ বিড়ালদের ট্রমার কারণে মৃত্যু ৪৭% ঘটেছে, যার অর্ধেক বিড়ালই বিভিন্ন জায়গায় রাস্তায় গাড়ির সাথে সংঘর্ষের কারণে আকস্মিক ট্রমার দ্বারা ঘটেছে।

আপনি যদি আপনার বিড়ালটিকে দূর্ঘটনার ফলে কিংবা ট্রমার দ্বারা মারা যাওয়া থেকে রক্ষা করতে চান, তাহলে অবশ্যই আপনার বিড়ালকে সব সময় বাড়ির ভিতরে রাখুন। যদি এরা পালিয়ে যায়, তবে তাদের দ্রুত তাদের ঘরে ফিরিয়ে আনুন। প্রয়োজন হলে এদের বেশি করে খাবারের লোভ দেখিয়ে সব সময় বাড়িতেই ব্যস্ত রাখুন। কারণ অনেক বিড়াল অত্যন্ত জেদি এবং এরা বাইরে যাওয়ার পরে ভিতরে ফিরে যেতে চায় না যতক্ষণ না তারা বুঝতে পারে যে এটি ততটা দুর্দান্ত নয় যতটা তারা একবার ভেবেছিল।

৩. কিডনির সমস্যা

যদিও ‘দ্যা রয়্যাল ভেটেরিনারি কলেজে’ এর গবেষণায় কিডনি সমস্যার কারণে বিড়ালের মৃত্যুর পরিসংখ্যান অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, তবু এটি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে কিডনি সমস্যা হলো ৫ বছরের বেশি বয়সী বিড়ালদের মৃত্যুর এক নম্বর কারণ। কিডনি সমস্যার ফলে বর্তমানে প্রায় ১৩.৬% বিড়াল মারা যায়।

৪ বছরের কম বয়সী বিড়ালদের মধ্যে কিডনি সমস্যার ঝুঁকি ১৩%, ৪-১০ বছর বয়সী বিড়ালদের ক্ষেত্রে ২৪%, ১০-১৫ বছর বয়সী বিড়ালদের ক্ষেত্রে ৩১% এবং ১৫ বছরের বেশি বয়সী বিড়ালদের ক্ষেত্রে কিডনি সমস্যার ঝুঁকি ৩২% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। তাই এ রোগের প্রতিরোধে বিড়ালদের যথেষ্ট যত্ন নেয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ বিড়ালদের মধ্যে খুবই সাধারণ। কিডনি সমস্যার ফলে বিড়ালের শরীরের থেকে বর্জ্য নিষ্কাশিত হয় না এবং এই বর্জ্য রক্তে প্রবাহিত হয়। তাছাড়া কিডনি সমস্যার কারণে বিড়ালের ওজন হ্রাস পায়, অলস ভাব সৃষ্টি হয়, রক্তচাপ বৃদ্ধি পায় এবং রক্তে অ্যামোনিয়া অ্যাসিডের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

এই উপসর্গগুলো সার্বিকভাবে বিড়ালের প্রস্রাবের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে, যার ফলে এদের জলের তৃষ্ঞা বাড়তে পারে এবং রক্তাল্পতাও হতে পারে। এছাড়া একটি সুইডিশ গবেষণায় দেখা গেছে যে, কিডনি সমস্যা হলো বিড়ালের এক নম্বর প্রস্রাবের রোগ যেটি খুবই মারাত্মক, কারণ ৭৮.৬% বিড়াল যারা মূত্রনালীর রোগে আক্রান্ত হয়েছিল তাদের কিডনি সমস্যা ছিল।

তাছাড়া বিড়াল কেনার আগে এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, পারস্যের বিড়ালগুলো কিডনির সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি রয়েছে।

বিড়ালের ডায়রিয়া না বমি হলে করণীয় কি জানতে ক্লি করুন

৪. বৃক্কজনিত ব্যাধি

৩টিরও বেশি গবেষণায় দেখা গেছে যে, বিড়ালদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে পাওয়া গেছে বৃক্কজনিত ব্যাধি। এর মধ্যে দুটি গবেষণা সুইডেন ও তাইওয়ানে করা হয়। তাই বৃক্কজনিত ব্যাধি প্রায়শই বিশ্বব্যাপী বিড়ালদের মৃত্যুর কারণ হয়ে থাকে।

ইংল্যান্ডে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, বৃক্কজনিত ব্যাধির কারণে ১২.১% বিড়াল মারা যায়। বৃক্কজনিত ব্যাধির মধ্যে সাধারণ কারণ হল রেনাল টিউমার, যা এক ধরণের নিউওপ্লাসিয়া (ক্যান্সার।

৫. মূত্রনালীয় সমস্যা

এক সুইডিশ গবেষণায় দেখা যায় যে, ৪,৪৯১টি মৃত বিড়ালের মধ্যে ৯০৭টি মূত্রনালীয় ব্যাধির কারণে মারা যায়। তাই বিড়ালের মৃত্যুর পরিসংখ্যানে মূত্রনালীয় ব্যাধি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সাধারণত ১০ বছরের বেশি বয়সী বিড়ালদের মধ্যে মূত্রনালীয় ব্যাধি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।

এখানে লক্ষ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ যে যখন এই গবেষণাটি করা হয়, তখন দেখা যায় যে অন্যান্য জাতের তুলনায় রাগডল জাতের বিড়ালটি মূত্রনালীয় ব্যাধিতে সংক্রমণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। তাছাড়া ইউরোপীয় ছোট লোমযুক্ত বিড়াল ও ফরাসি বিড়ালদেরও প্রস্রাবের ব্যাধি হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। তাই আপনার যদি এই বিড়ালগুলির মধ্যে কোনো একটি থাকে, তাহলে তাদের দিকে বিশেষ নজর রাখুন।

৬. সংক্রামক রোগ

ইনফেকশন বা সংক্রামক শব্দটি আমাদের কাছে খুব পরিচিত একটি শব্দ। ইনফেকশন বা সংক্রামণ বিভিন্ন ভাইরাস দ্বারা হতে পারে। তবে বিড়ালের সবচেয়ে সাধারণ সংক্রামক রোগের মধ্যে রয়েছে- ফেলাইন লিউকেমিয়া ভাইরাস (FeLV) ও ফেলাইন ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস (FIV)। জার্মানি, সুইডেন ও ফ্রান্সে করা গভেষণা থেকে বিড়ালদের মৃত্যুর সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো ভাইরাস দ্বারা সংক্রামিত হয়ে মৃত্যু।

গভেষকরা পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, বিড়ালরা মূলত ফেলাইন প্যানলিউকোপেনিয়া ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হয়েই মারা যায়। এই ভাইরাসটি একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাস যা ফেলাইন পারভোভাইরাস থেকে উদ্ভূত। ফেলাইন প্যানলিউকোপেনিয়া ভাইরাস সবচেয়ে বেশি কম বয়সী বিড়ালছানাদের সংক্রামিত করে। এ ভাইরাসটি বিড়ালের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয় এবং তাদের অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতা ও সংক্রমণের প্রতি অনেক বেশি সংবেদনশীল করে তোলে। যার ফলে এ সময় বিড়ালটি মারা যায়।

তবে সাধারণত এ ভাইরাসটি ১ বছরের কম বয়সী বিড়ালদের জন্য সবচেয়ে বিপদজনক ও মারাত্মক। ১ বছরের বেশি বয়সী বিড়ালদের এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার কিংবা মারা যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৯০% থেকে ৪০% পর্যন্ত কমে যায়।

বিড়ালের জন্য কি কি খাবার ক্ষতিকর তা জানতে এই আর্টিকেলটি পড়ুন

৭. নিওপ্লাসিয়া

নিওপ্লাসিয়া হল অনিয়ন্ত্রিত নিওপ্লাস্টিক কোষের অস্বাভাবিক বিভাজনের ফলে সৃষ্ট অস্বাভাবিক অবস্থা। মূলত এটি একটি টিউমারজনিত ক্যান্সার রোগ। ইংল্যান্ডের এক গভেষণায় দেখা গেছে যে, এর কারণে প্রায় ১০.৮% বিড়ালের মৃত্যু ঘটে। মৃত্যুর এই অনুপাতটি শুনে আপনি যতটা অবাক হবেন, তার চাইতেও বেশি অবাক হবেন এটা শুনে যে বিড়ালের নিওপ্লাসিয়া প্রতিরোধ করা এখনো দুষ্কর।

Leave a Comment